:

টানা বৃষ্টিতে ভাসছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার: ৪২ বছরের রেকর্ড ভেঙে জনজীবন বিপর্যস্ত

top-news

আকাশভাঙা রেকর্ড বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল আর সাগরের তীব্র জোয়ারের ত্রিমুখী প্রভাবে লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ পুরো উপকূলীয় অঞ্চল।

জুলাই মাসের ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে চট্টগ্রামে একপর্যায়ে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

নজিরবিহীন এই দুর্যোগে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। পাহাড় ও দেয়ালধসে নারী ও শিশুসহ ১১ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে তলিয়ে গেছে রেললাইন, বন্ধ হয়ে গেছে কক্সবাজার রুটের ট্রেন চলাচল।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও কক্সবাজার জেলার বুধবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরেও নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা।

রোববার সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি সোমবার ও মঙ্গলবার টানা মুষলধারে রূপ নিলে পুরো চট্টগ্রাম নগরী এক বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়।

আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই মাসের ইতিহাসে চট্টগ্রামে এটিই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৫ জুলাই ৪০৭ মিলিমিটার এবং ১৯৫৫ সালের ১৪ জুলাই ৪১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।

তবে আবহাওয়াবিদদের মতে, জুন বা আগস্টে এর চেয়েও বেশি বৃষ্টির রেকর্ড আছে (যেমন—১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ৫১১ মিলিমিটার)।

সাগ্রিক এই আবহাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, সাগরে সৃষ্ট একটি স্থল নিম্নচাপ ভারতের দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড এলাকায় অবস্থান করছিল, যার ব্যাস ছিল প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার। উত্তর গোলার্ধের নিয়ম অনুযায়ী ঘূর্ণায়মান বাতাস ডান দিকে বেঁকে চলায় এই নিম্নচাপ বলয়ের ডান প্রান্তে থাকা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে প্রচুর জলীয় বাষ্প আঘাত করে। এই জলীয় বাষ্প উপকূলীয় পাহাড়ে বাধা পেয়ে এখানে দফায় দফায় অতিভারী বর্ষণ ঘটায়।

মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে আজ বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্তও চট্টগ্রামে ২৮৪ মিলিমিটার অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী আরও অন্তত দুই দিন এই পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে।

টানা বৃষ্টি ও সাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত জারি থাকায় জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শহরের ভেতরের পানি নামতে বাধা দিচ্ছে। ফলে নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, সিডিএ আবাসিক এলাকা, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, কাপাসগোলা, বাকলিয়া এবং হালিশহরসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে গেছে। ঘরবাড়ি, দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় বাসিন্দাদের দিন কাটছে চরম আতঙ্কে।

প্রধান সড়কগুলোতে গণপরিবহন না থাকায় অফিসগামী যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলমগ্ন রাস্তায় আটকে থাকতে দেখা গেছে। রিকশাচালকেরা সুযোগ বুঝে আদায় করছেন কয়েক গুণ অতিরিক্ত ভাড়া।

দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ায় অনেক এলাকায় এবার পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকেনি এবং বৃষ্টি কমলে দ্রুত নেমে গেছে। তবে হিজড়া খাল, জামালখান খাল ও গুলজার খালের অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ কাজ বাকি থাকায় কিছু এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা হচ্ছে।

নালা পরিষ্কার করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে পলিথিন, প্লাস্টিক ও ককশিট পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এ ছাড়া জরুরি দুর্যোগ মোকাবেলায় চসিক ও রেড ক্রিসেন্টের সমন্বয়ে ১০১ সদস্যের একটি ‘র‌্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠন করা হয়েছে এবং জরুরি সহায়তার জন্য একটি হটলাইন নম্বর (০১৮০৫-৭৮৩৩৮৯) চালু করা হয়েছে।

মেয়র পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় বসবাসকারীদের পাহাড়ধসের ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জোর আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত দুদিনে উখিয়া-টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্প, কক্সবাজারের দরিয়ানগর, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এবং রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে পাহাড় ও দেয়ালধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী লাখো রোহিঙ্গা এবং ২০ হাজারেরও বেশি স্থানীয় পরিবার বর্তমানে চরম ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রশাসন  পক্ষ থেকে বারবার নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুর মুখে বাস করছেন।

অন্যদিকে, সাগরের উত্তাল ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে। গত পাঁচ দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় দ্বীপে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং জেলেরা সাগরে যেতে না পারায় জীবিকা সংকটে পড়েছেন।

ভারী বর্ষণের বড় ধাক্কা লেগেছে যোগাযোগ ও শিক্ষা খাতে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের জানআলীহাট ও ষোলশহর এলাকার রেললাইন সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এই রুটে সব ধরনের ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ৬৫০ জন যাত্রীসহ ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি মঙ্গলবার দুপুরে ষোলশহর স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত যাত্রা বাতিল করে ঢাকায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও সংযোগ সড়কে পানি জমায় ফ্লাইট ওঠানামা ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে বিপর্যয় এড়াতে চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীনে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও কক্সবাজার জেলার বুধবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে বিকল্প সেটের প্রশ্নে অনুষ্ঠিত হবে। একই সাথে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বুধবারে অনুষ্ঠিতব্য সকল ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।

ভারী বর্ষনের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানী-রফতানী বাণিজ‌্যে প্রভাব পড়েছে। বর্হিনোঙ্গেরে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। সাগার উত্তাল থাকায় বন্ধ রয়েছে আভ্যন্তরীণ রুটে লাইটার জাহাজ চলাচল। অতি বর্ষণের কারনে চট্টগ্রাম বন্দরেরর অভ্যন্তরে পণ‌্য ডেলিভারীসহ জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সাথে মানবসৃষ্ট অপরিকল্পিত নগরায়ন ও পাহাড় কাটার খেসারত দিতে হচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষকে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রামের অনন্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করে প্রকল্প তৈরি, শহরের মূল ১০৪টি খালের মধ্যে ৪৭টি খাল হারিয়ে যাওয়া এবং ১৪ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পগুলোর ধীরগতির কারণেই আজকের এই বিপর্যয়।

সাঙ্গু, হালদা ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বন্যার আশঙ্কা আরও তীব্র হচ্ছে। আকাশ কবে পুরোপুরি পরিষ্কার হবে তার উত্তর আপাতত মেঘের কাছেই, তাই চট্টগ্রামের মানুষের জন্য আপাতত ছাতা আর রেইনকোটই একমাত্র ভরসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *